রবিউল আলম ফিরোজ’র রম্য- জগলুর পোয়াবারো
জগলুর পোয়াবারো
- রবিউল ফিরোজ
পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিতে মহাখুশি জগলু। সারাদেশের মানুষ যখন পেঁয়াজের ঝাঁজে অস্হির জগলু তখন শুধু হাসে আর হাসে। তার দান লেগে গেছে। ধনী হওয়া এবার আর আটকায় কে। রাজনীতি বুঝে না জগলু। তবু সে সরকার বাহাদুরকে বারবার ধন্যবাদ দেয়। চায়ের স্টলের রাজনীতি আড্ডায় সাড়ম্বরে যোগ দেয়। সরকারের অবদানের কথা বলতে বলতে তৃষ্ণা লেগে যায়। ঢকঢক করে একগ্লাস পানি খায়। আরেকদফা অর্ডার করে লাল চায়ের। নতুন উদ্যোমে আবার শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের গুণকীর্তন। জাহাঙ্গীরের টি-স্টলের নিয়মিত খরিদ্দারেরা জগলুর দিকে ফিরে ফিরে তাকায়। জগলুর পঞ্চমুখ প্রশংসায় লোকজন ভাবে জগলু বোধহয় নিম্বরি (মেম্বারী) ভোটে দাঁড়াবে। কেউকেউ আঁড়েউঁতে বলেই ফেলে ভোটেত দাঁড়াবু নাকি? । জগলু হেসে বলে, আমারে কি বোকায় পাইছে যে মাইনক্যাচিপায় পা দিমু? ফিরি ফিরি(ফ্রি) চা খাবার আশা এ্যানা ছাইড়া দ্যাও।
সেদিন পেঁয়াজ নিয়ে যাচ্ছে ডোমার। নিজের জন্যে একটা টিকেট নিতে যায় কাউন্টারে। টাকা দিয়ে যথারীতি টিকেট নেয় জগলু। আসন বরাদ্দ করে দেয় তাকে। এরপর ট্রেনের রেগুলার প্যাসেঞ্জার জগলু মিয়াকে অফিসার বলে, বিশটা টাকা দাও চা খাবো। স্টেশনের টিকেট দেনেওয়ালার ওপর ক্ষেপে যায় জগলু। ঠেলা গুঁতো চাপা খেয়ে খেয়ে বুঝতে শিখেছে জগলু। প্রতিবাদ করে সে, আপনেরে কি সরকার বেতন দেয় না? আমাগের কাছে ট্যাকা চান ক্যারে? আমি কি ট্যাকার বস্তা লিয়া আইছি?
সামনে কুরবানীর ঈদ আসিচ্চে। নিয়ত করিছি আল্লার ওয়াস্তে একটা ভেড়া কুরবানী দিমু। এমনি চিন্তায় আমার মাথা ঘুরিচ্চে। তার উপুর আবার বিশ ট্যাকার দাবি। কামাই করা ট্যাকা য্যান চাইলেই হলো। আপনেরা পাছেনডা কি?
সেদিন টাকা ওঠাবার জন্যে ব্যাংকে গিয়েও এই রকম একটা ঘটনা ঘটেছে। ক্যাশিয়ারকে জমা দিয়েছে ছয়হাজার বিশ টাকা। হিসাবে জগলু ফেরত পাবে দুই টাকা। টাকা দুটো ফেরত পাবার আশায় সে হাত পেতে থাকে কিন্তু অফিসার টাকা ফেরত দেয়ার নাম করে না। ব্যস্ত থাকেন অন্য কাজে । জগলু স্মরণ করিয়ে দেয়, আমার দুইড্যা ট্যাকা ফিরত দ্যান। অফিসার বলে , দুই টাকা ফেরত দেয়া যাবে না। মাত্র তো দুইটা টাকা । আমার যাতায়াতের রিকশা ভাড়া লাগে না?
উত্তর শুনে চড়চড় করে ক্ষেপে ওঠে জগলু। আপনের কি রিকশা ভাড়া দেয়ার চুক্তি লইছি আমি? ক্যান আপনে বেতন পান না? লিজের ট্যাকা দিয়্যা রিকশা ভাড়া দ্যান গা। ট্যাকা কামাই করতে ঠ্যালা লাগে। পরের ট্যাকার উপুর এত লোভ ক্যারে?
জগলুর উচ্চবাচ্য শুনে ম্যানেজার সাহেব এগিয়ে আসেন। ঘটনা শুনে জগলুর দুই টাকা ফেরত দিয়ে ক্যাশিয়ারকে তুলোধনা করেন। টাকা ফেরত পায় তবু গজরাতে থাকে জগলু, ট্যাকা য্যান ছোলের হাতের মোয়া। আরে এই জগলুরে মানুষ ঠকাতে ঠকাতে ত্যানাত্যানা করি ফালাইছে। রাইত দিন রাস্তাঘাটে পড়্যা থাকি। হোট্যালের বাসিপচা খায়ে পেঁজের ব্যবসা করি। কই কেউ তো কয় না একটা ট্যাকা বেশি লে। আইজকা তোমাগের চায়ের বিল দেয়া লাগে, রিকশা ভাড়া দেয়া লাগে, ঠাণ্ডামাণ্ডা খাওন লাগে। বাপরে বাপ হাজী মহসিনের মুতো আমার য্যান রাজত্বরী আছে ! কষ্টের কথা বলতে বলতে জগলুর চোখ দুটি জলে ভরে ওঠে। সম্বিত ফিরতেই লজ্জা পেয়ে চোখ মুছে নেয়। লোকে কী ভাববে? সকলে মনে করবে মাত্র দুইটি টাকার জন্যে কান্নাকাটি করে জগলু।
সত্যিই এবারের খ্যাপে জগলুল হায়দার রাজত্বরী পেয়ে যায়। কিংবা পেঁয়াজের বেপারী জগলু যেন আলাদিনের চেরাগ পায়। কোনদিন ভেড়ার মাংস খায়নি জগলু। সে কারণেই নিয়ত করেছে এবারের ঈদে ভেড়া কোরবানী দেবে। তার নিয়ত সত্যি হতে চলেছে। তার স্টক করা পেঁয়াজে কেজি প্রতি বিশ টাকা লাভ হয়। জগলুর পোয়াবারো অবস্থা। খুশির ঠেলায় সে বাড়িতে ফেরার পথে রাজমিস্ত্রি ধরে নিয়ে আসে। তাকে বারবার বলে, বাড়ির ভিতরে ইটা বালু রড সেমেট দিয়া আমারে একটা পেঁজের মূর্তি বানায়া দ্যাও। লিত্যিদিন সকালে আমি ওরে দেকপো আর সালামালেকুম দিবো।
জগলুর কথা শুনে রাজমিস্ত্রি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
ছবিসহ লেখা পাঠান এই ঠিকানায়-
kachagollamagzine@gmail.com

No comments