মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এর অনুগল্প
বুড়ো হবে বলে বড় হতেও ভয় পায়
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
লিখতে
বসলে আমি প্রথমে তারিখটা লিখে নিই। তারপর লিখা শুরু করি। তাতে লিখা শুরু
করার আগেই খানিক্ষণ থামতে হয়। আমার তারিখ মনে থাকেনা। দেয়ালে তাকিয়ে লাভ
হয়না। ক্যালেন্ডার তারিখ বলে দেয় না। আজ কত তারিখ সেটা জানতে হলে, কাল কত
তারিখ ছিল, সেটা মনে রাখতে হয়। যন্ত্রকে আমি বিশ্বাস করি না। ফলে ঘড়ি দেখি
না, মুঠোফোন দেখি না। ওরা কবে কোন তারিখ দেখাবে, তা তো আমিই ওদেরকে বলে
রেখেছি। এখন আবার ওদের কাছ থেকে জেনে নিলে, তাতে কতটুকু ভরসা? ভেতরে ভেতরে
ওরা কী গোলমাল করে বসে আছে--টেরও পাব না। পত্রিকা বিশ্বাস করি। ছোটবেলায়
পত্রিকার নামের নিচ থেকে বাংলা ও আরবি সনের তারিখ জেনে নিতাম। সারাদিন মনে
রাখতাম, আজ আষাঢ়ের পয়লা।
পত্রিকা
আসতে দেরি হচ্ছে আজ। আমি মুঠোফোনটা হাতে নিলাম। সেদিন সিয়াম ক্যালেন্ডার
বের করে ওর বার্থ ডে দেখিয়ে বলেছিল, “জান চাচ্চু, এবছর আমার বার্থ ডেতে
ব্লু মুন। তিন বছর পরপর ব্লু মুন দেখা যায়। এ বছর ৩১ শে জানুয়ারিতে ব্লু
মুন। জানুয়ারির ২ তারিখে মাসের প্রথম ফুল মুন। যে মাসে দুটো ফুল মুন হয়,
দ্বিতীয় ফুল মুনকে বলে ব্লু মুন। চাচ্চু জান, এ বছর দুবার ব্লু মুন
হবে--মার্চের ৩১ তারিখে আরেকবার হবে...”
আমি
চেঁচিয়ে উঠলাম, “আজ কত তারিখ?” শাহানা আশপাশে থাকলে জবাব দেবে। কোনো সাড়া
নেই--নিরবতা। কাল থেকে ওর সাথে আমার মুখ দেখাদেখি বন্ধ। টুকটাক কথা
চলছে--ঠেস্ দিয়ে। কাল থার্টি-ফার্স্ট ছিল, মনে পড়ল। আমি গোঁয়াড়ের মতো
সারারাত লিখেছি।
দিন মাস লিখার পর সন লিখতে গিয়ে হাত কাঁপল--এক বছর বুড়ো হলাম। আমি লিখতে শুরু করে দিলাম--
--‘মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়’--প্রতি পনেরো দিন পরপর আমি আমার তত্ত্ব থেকে সরে যাই।
-- ডাইনে সরেন, না বায়ে?
-- উপরে উঠি। বড়ো হই...
![]() |
| মোহাম্মদ কামরুজ্জামান |
দরজার
বাইরে শাহানার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। ও জানে, আমার শুচিবায়ু আছে, তারিখ
না লিখে আমি লেখা শুরু করতে পারিনা। এতক্ষণে নিশ্চয় আমার ভাব উবে
যাচ্ছে--মহাজগতের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বুঝি। ও দরজার বাইরে ধুপ্
ধুপ্ করে হাঁটছে--তারিখ মনে করিয়ে দেওয়া খুব দরকার, কিন্তু আরেকবার না
জিজ্ঞাসা করলে, বলা ঠিক হবে না।
“কাল কত তারিখ ছিল?” দরজার ওপাশে শাহানা ঠেস্ দিয়ে উঠল।
আমি লিখছি--
...তবে
সবাই বড়ো হয়না। কেউ কেউ বুড়ো হবার ভয়ে বড়ো হতে চায়না। বয়স জানতে চাইলে
বলে, ঊনত্রিশ। আমাকে বললে ক্ষতি নেই, কিন্তু ডাক্তারকে বলে কেন? কৈফিয়ত
চাইলে বলে, উনিশ থেকে ঊনষাট সবার ওষুধ এক...
আমার কাছ থেকে কোনো আওয়াজ না পেয়ে, অদৃশ্য শাহানা বলল, “কাল থার্টি-ফার্স্ট ছিল--৩১ শে ডিসেম্বর।”
আমি
চুপ। মনে মনে বললাম, “আজকে তো আর থার্টি-ফার্স্ট নেই। আজ আমাকে আবার কী
করতে হবে?” দরজার বাইরে ওর চুড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। বোধ হয় তর্জনি বাঁকা করে
ঠোঁটের উপর ধরেছে। চিন্তায় পড়ে গেলে ও একাজটি করে। আর যেটি করে, সেটি
হচ্ছে, কর গুনে হিসেব করে। বোধ হয়, নিশ্চিত হতে পারছে না, আমি শুনেছি কিনা।
এতক্ষণে মহাজগতের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে নিশ্চয়ই।
বোকা
মেয়ে--অল্পতেই বিচলিত হয়। আগের থেকে একটু জোরে আওয়াজ করে বলল, “তাহলে ৩২
শে ডিসেম্বর ২০১৭ আজ।” মনে হলো দরজার আরেকটু কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ও। আমি
লিখলাম--
...মনের পথ ধরে এক বেলা এগুলে, বুদ্ধির
গন্তব্য থেকে এক বছর পিছিয়ে যাই। কাজে মাথা খোলে না। যখন খোলে, তখন তা থেকে
কেবল ফাঁকি দেবার ধারনা বের হয়। মন খুলতে চাইনা, কিন্তু তাই খুলে যায়
বারবার, নলেন গুড়ের মতো ভালোবাসা চুয়ে বেরিয়ে আসে, সবকিছু নষ্ট করে দেয়...
আজ আর লিখবননা। কলম খাপে ভরে রাখলাম।
[নববর্ষের দিন, ২০১৮/ গুলশান, ঢাকা]
ছবিসহ লেখা পাঠান এই ঠিকানায়- kachagollamagzine@gmail.com

No comments