ছোট গল্প
শীতের সকাল
শামীম শিকদার
শামীম শিকদার
___________________________
কুয়াশায় চারদিক ঘিরে আছে। গাছ গুলোতে কুয়াশা পড়ে সাদা সচ্ছ জলে ভিজে আছে
পাতা গুলো। টিনের চালে টুপ টুপ করে জল পড়ছে, চাল থেকে জলগুলো বেয়ে বেয়ে
নিচে পড়ছে। শিশির বিন্দু গুলো সবুজ ঘাসের সাথে লুটোপুটি খাচ্ছে। ভোরের
পাখি গুলো যেন এখনও ঘুমিয়ে আছে কোন সাড়া শব্দ নেই। ভোরের পাখির মতো লিজাও
কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমের দেশে ইচ্ছা মতো বিচরন করছে। হয়তো কতক্ষন পর পাখি
গুলো তাদের নীড় থেকে একটি দুটি করে বেরিয়ে গাছের ডালে বসে শরীরটা হালকা
ঝাকি দিয়ে ডাকা শুরু করবে কিন্তু যতক্ষন লিজার মা ঘুম থেকে উঠার জন্য তাকে
না বলবে ততক্ষন সে তার ইচ্ছা মতো ঘুমাবে। ভোরের কুয়াশায় ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে
কম্বলের নিচের উষ্ণ গরম হাওয়াটা খুব বেশিই অনুভব হয় তাই ঘুম ভেঙ্গে গেলেও
তার উঠার কোন নাম থাকে না। শুধু লিজা কেন? এমন মনোরম উষ্ণ পরিবেশ থেকে
কনকনে ঠান্ডায় আসতে কে বা চায়। তবে যদি প্রকৃত প্রকৃতির রূপটা অনুভব করতে
ইচ্ছা হয় তবে আর কম্বলের নিচে মন সায় দিবে না। সবার তো আর প্রকৃতির প্রতি
আকর্ষন থাকে না। লিজা মধ্য দুপুর পর্যন্তও ঘুমাতে পারে কিন্তু লিজার ছোট
ভাই লাবিব খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাবে। শীতকাল হলে তো কোন কথায় নেই সকাল
সকাল ঘুম থেকে উঠে দাত ব্রাশ করে লুঙ্গির উল্টে বেধে তাতে মুড়ি নিয়ে খেতে
খেতে চলে যাবে পাড়ার আসরে। যেখানে বিভিন্ন কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে চারপাশে
গোল করে পাড়ার মানুষ গুলো বসে থাকবে। একে অপরের সাথে সুখ-দুঃখের গল্প
করবে। পাশে থাকবে একটি বাটিতে পেঁয়াজ মরিচ ও সরিষার তেল দিয়ে মাখানো কিছু
মুড়ি। লাবিব এখানে আসে আগুনে কাঠ দেওয়ার জন্য। পাড়ার বড়রা আগুন ঠিকই
জ্বালায় কিন্তু জ্বালানো পর্যন্তই শেষ পরে আর কোন খোঁজ খবর থাকে না। যা
করার তা করে পাড়ার ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা, বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঠ বা শুকনা
বাশের টুকরো দৌড়ে নিয়ে আসবে আগুনের কাছে পুড়া শেষ হতে না হতেই একটি একটি
করে কাঠের টুকরো গুলো ঢিল মেরে আগুনে দিবে। মাঝে মাঝে বসে থাকা বয়ষ্ক
লোকের মাঝে দু একজন ধমক দিয়ে দাড়িয়ে উঠে। ধমক খাওয়া ছেলে-মেয়ের দলের মাঝে
লাবিবও একজন। সূর্য মামা যখন গাছের এক পাশ দিয়ে উকি দেয় তখন আগুনের গোল
বৈঠক ভেঙ্গে সবাই ছুটে যায় সূর্য মামার কাছ থেকে একটু গরম উষ্ণতা নিতে।
বড়দের সাথে সাথে পিছু পিছু ছোটে যায় ছোটরাও।
সূর্যের সোনালি রোদ পড়ে সবুজ ঘাসের উপর জমে থাকা শিশির গুলো চিক চিক করতে থাকে। কৃষকের পাকা ধান ক্ষেতের সোনার মতো ধানগুলো সূযের আলো পেয়ে যেন খাটি সোনায় পরিনত হয়। ধিরে ধিরে এক স্থান থেকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে সূর্যের আলো। এমন সময় গাছ থেকে খেঁজুরের কাঁচা রস নামাতে আসে। তখন ছোট একটি গ্লাস নিয়ে রসের কলসির কাছে দৌড়ে যায় লাবিব। এক গ্লাস কাঁচা রস খেয়ে শরীরটা কেমন যেন শিরশির করতে থাকে তার। তখন আরেকটা দৌড় দিয়ে বাড়িয়ে গিয়ে মোটা আরেকটা শীতের জামা পড়ে আসে। জামা পড়ার ফাঁকে একটু সময় করে লিজার কানে কানে ফিস ফিস করে বলে আসে আপু... খেঁজুরের রস নামিয়েছে। লাবিবের কথা শুনে শীতের উষ্ণ গরম পরশের চাদর ভেঙ্গে সে আসে রসে ভরা কলসিটির কাছে, হাতে থাকে একটি গ্লাস। শীতকালে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এমন ভাবেই কাটে তাদের। তবে অতিরিক্ত কুয়াশায় যেদিন সব ঢেকে যায় সেদিন তারা ঘরে জড় বস্তুর মতো হয়ে বসে থাকবে। যেমন থাকে পুকুরের জলগুলো। কোন নড়া-চড়া নেই একদম স্থির। লাবিবের যদিও ঘরের ভিতরে বসে থাকতে মোটেও ভাল লাগে না তবু মার বকুনিতে বাধ্য হয়ে তাকে বসে থাকতে হয়। তাছাড়া এমন দিনে সে কি কান্ড ঘটায় তা সে নিজেই ভাল জানে। এইতো কয়েকদিন
কয়েকদিন আগে সকাল সকাল স্কুলে তার প্রইভেট। সামনে পঞ্চম শ্রেনী থেকে ফাইনাল পরিক্ষা বলে নিয়মিত প্রইভেটে যেতে হয়। কেউ সহজে প্রইভেট বন্ধ করে না তার ক্ষেত্রেও তার ভিন্ন কিছু নয়। বাধ্য হয়ে শরীরে কম্বলের মতো একটি শীতের কাপড় দিয়ে স্কুলের উদ্যেশে হাটতে থাকে। রাস্তার সামনে কি হচ্ছে তা বুঝা যায় না। কুয়াশার হার এতো বেশি যে, দু তিন হাত দূরের অবস্থা বুঝাই মুশকিল। লাবিব হাটছে আর মনে মনে লিজাকে বকছে। কারন সে যখন স্কুলে না আসার জন্য বায়না ধরে ঠিক সেই মুহূর্তে লিজা মার কাছে তার বিরোদ্ধে হাজারটা বিচার দিয়ে আসবে তখন মার বকুনি আরো বেশি বেড়ে যায় পরে কি আর না এসে উপায় আছে? সামনে একটি মানুষ দেখা যাচ্ছে খুব দ্রুত হাটছে। মানুষটিকে ধরার জন্য লাবিবও হাটার গতি বাড়িয়ে দিল। কতক্ষন হাটার পর মানুষটি অদৃশ্য হয়ে গেল। তার মনে কিছুটা ভয় জাগল আবার অন্য কথাও ভাবছে এতো কুয়াশার মাঝে হয়তো মানুষটি খুব দ্রুত হেটে চলে গেছে। যাই হোক, পরে আর ঐ দিকে সে মন দিল না, তার মতো সে হেটে যাচ্ছে স্কুলের দিকে। মাথায় কুয়াশা পড়ে মাথাটাও অনেকটা ভিজে গেল। শরীরটা কনকনে শীতে পুরো বরফে রুপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে হাত ও মুখ। কারন পায়ে রয়েছে কেডস্ তার ভিতরে মোটা এক জোড়া মুজা। শরীরে একটি গেন্টি তার উপর ফুল হাতার শার্ট উপরে তো মোটা একটি জেকেট থাকছেই, মাথায় টুপি ও গলায় পেচানো গরম কাপড়।
কিন্তু কি আর করার মা ও বড় বোনের জ্বালায় এগুলা সাথে না নিয়ে আর উপায় আছে? স্কুলের বারান্ধায় আসতেই ক্লাসের ভিতরে তাকিয়ে দেখে সকলে এসে উপস্থিত শুধু তারই দেরি হয়েছে। ক্লাসে যেতেই স্যার বলে উঠল লাবিব আজ আসতে তোমার খুব কষ্ট হয়েছে? সে আর কি বলবে? না, না কি হ্যা ভেবেই পাচ্ছে না। প্রথম ভেবেছিল হ্যা বলবে তাতে যদি কয়েকদিন প্রইভেটটি বন্ধ দিয়ে দেয় তবে আর কষ্ট করে আসতে হবে না পরে অনেক ভেবে আবার মনে পড়ল বন্ধ দেওয়ার বদলে তার মার কাছে বিচার দিলে তার দফারফা হাল হবে। কতক্ষন ভেবে-চিন্তে করে বলল না স্যার তেমন নয়, অনেক কুয়াশা তো তার মধ্যে শীতটাও একটু বেশি।
স্যার পড়ানো শুরু করল, সকলে খুব জড়োসড়ো হয়ে বসে স্যারের কথা গুলো শুনছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলের ছিল অনেক বেশি মনযোগ। অন্যান্য সময় ক্লাসে এতো বেশি মনযোগ থাকে না সকলের, ঐ সময় তারা খুব সহজেই যাতায়াতের জন্য যানবাহন পায় তাই তাতে করে চলে আসতে পারে কিন্তু এতো শীত ও কুয়াশার মাঝে কোন কোন যানবাহন থাকে না তাই তাদের বাধ্য হয়ে পায়ে হেটে আসতে হয়। স্যার সকলকে উদ্যেশ করে আবার বলল দেখলে তোমরা কষ্ট করে কোন জিনিস অর্জিত করলে তার প্রতি আকর্ষন যেমন বেশি থাকে তেমন মনযোগও বেশি থাকে আর সহযে যা পাওয়া যায় তা খুব সহজেই হারিয়ে যায়। স্যারের উদাহরন গুলো এমনই খুব বাস্তবতা নিয়ে হয়ে থাকে। প্রইভেট শেষে একটু একটু রোদ দেখা দিচ্ছে সকলে যার যার মতো করে তাদের বাড়ি চলে গেল। লাবিবও তার বাড়িতে চলে আসল।
ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া, গাজীপুর
ছবিসহ লেখা পাঠান এই ঠিকানায়- kachagollamagzine@gmail.com
No comments