Home

বিজ্ঞপ্তি- কাঁচাগোল্লা ম্যাগাজিনের নিয়মিত প্রকাশনা চলছে। এখনই আপনার স্বরচিত সাহিত্যকর্ম পাঠিয়ে দিন। ই-মেইল করুন: kachagollamagzine@gmail.com  
    আপনার লেখা প্রকাশের নির্ভরযোগ্য ম্যাগাজিন। 


লেখালেখি

ফেসবুকীয় লেখক ও প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম


ফেসবুককে শাবাশ বলি। তার অনুগ্রহ বা বদৌলতে কেউ কেউ একটা আইডি খুলে অন্যের দেখে দুয়েকটা লাইন থেকে একটি ছড়া বা অছড়া লিখে নিজেকে ইয়েটিয়ে ভেবে অতি দ্রুত ছড়াকার হওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায়! কেউ বা আশপাশে খোঁজ করে পেয়ে যায় কাউকে। এমন কয়েকজনকে কাছে পাওয়ার দুর্ভাগ্য হয়েছিল আমার। তারা যে করে হোক জেনে গেছে আমার কাছে এলে তাদের ছন্দ, তাল, মাত্রা আরো নতুন মাত্রা পাবে! কেউ কেউ তো রীতিমতো গুরু বলা শুরু করে দিলো। 'আমার লজ্জা লাগে' বললেও আমার প্রতি তাদের ভক্তি দেখে তখনই ভেবেছিলাম, 'অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ'! আবার যাদের লেখা জীবনেও কোনোদিন কারেকশন করে দিইনি বা তারা কারেকশন করে চাননি, তারাও এখনো আমার স্টাটাসে আমাকে গুরু সম্বোধন করেন, কেন সেটা জানি না- তবে অনুমান করি যে, যাদের লেখা কারেকশন করে দিই তাদের সাথে এনাদের ফেসবুকীয় যোগাযোগের কারণে। তাদের সবার প্রতি আমি বিনয়ী। এটা হয়তো আমার বড় দোষ যে, জেনেশুনে ছোটদের সামনেও বিনয়ী হয়ে যাই! বাস্তবে যে তাই। অামার বিনয়ে আমার শুভাকাঙ্খী বা সতীর্থ একজন আমাকে বকা দেওয়ার সুরে বলেছিলেন 'আজ যাদের শেখাচ্ছেন, তারা একদিন আপনার সম্পর্কে বলে বসবে যে, সাঈদকে তো আমিই শেখালাম।' বাস্তবে তা উপলব্ধি করার শক্তিও আমাকে অর্জন করতে হয়েছে। 

যা হোক, একদিন এক ভক্ত!(স্বার্থের জন্য) আমার লেখার বিষয়কে এবং ছন্দকে নিয়ে লিখে নিয়ে এলো আমার কাছে কারেকশন করে নিতে! লজ্জা পাবে তাই একটু ভিন্নভাবে বললাম 'অন্যকে হুবহু অনুসরণ করা ঠিক না'। জবাব এলো যে, সেটা নাকি তার অনেকদিন আগের লেখা! তাকে আর লজ্জা না দিয়ে বরং কারেকশন করেই দিলাম। এখন তাদের অনেকেই অনেক বড় মাপের ছড়াকার বা অছড়াকার! চায়ের দোকানে হোক, ইনবক্সে হোক আর মোবাইলেই হোক তাদের অনেকর অছড়াকে ছড়া বানানোটা আজো আমার নিত্যদিনের রুটিন। সেই সাথে তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে জাতীয় বা স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠানো শুরু করে। দুয়েকটা প্রকাশও হতে থাকে! তাদের সাথে আর কে পারে? যা হোক, আমি লোকটা ভালো নই বলেই তো আমার কথায় কষ্ট পেয়ে!(তার স্বার্থে লেগেছে) আমার কোনো কোনো ভক্ত রীতিমতো আমাকে তার ফেসবুক সীমানার বাইরেও রেখে দিয়েছে! যেখানে একদিন সে গুরু বন্দনা করেছিল, পরে সেখানেই তার গুরু গঞ্জনা আমি নিজ চোখে না দেখলেও অন্যের মুখে তা শুনতে হয়েছে আমাকে! 

ফেসবুকের আশীর্বাদে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার বিভিন্ন পাতার সম্পাদকদের সাথে কারো কারো বেশ ভাব গড়ে উঠতেই পারে। যা হোক, যারা লিখছেন তারা তো আর সবটাই খারাপ লেখেন না। সম্পাদক মহোদয়গণও তাদের উৎসাহিত করতে একটু এডিট করে হলেও তাদের কিছু লেখা প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু কোনো লেখক(!) আবার এমন এডিট করাটা মোটেই পছন্দ করেন না এই ভেবে যে, পৃথিবীর সেরা লেখাটি তিনিই লিখে ফেলেছেন! কিন্তু সম্পাদক মহোদয়গণও তো আর সব লেখাই এডিট করার সময় পান না, তাই নিজেকে বিখ্যাত ভাবার সেই  সব লেখক(!) সম্পাদকদের এমনও সমালোচনা করেন যে, সম্পাদকের সম্পাদিত পাতা আর আগের মতো মানসম্পন্ন নয়। তার মানে, আগে অমন (লেখকের!) লেখা ছাপা হতো বলেই সেটা বেশ মানসম্পন্ন ছিল! এখন সম্পাদকগণ তার লেখা ছাপেন না বলেই সে পাতার গুণাগুণ কমে গেছে! এমন সব মন্তব্য কারো মুখে শুনলে বা ফেসবুকে দেখলে সেই গুরু বন্দনা থেকে গুরু গঞ্জনার বিষয়টি চোখে ভেসে ওঠে আমার। 

কেউ দেখি ফেসবুকে বেশ লিখতে পারেন। যদিও আমি জানি 'যাগগে বাবা আজকে থেকে এই ধারণা বদ্ধমূল/ আগ বাড়িয়ে কাউকে কিছু বলতে যাওয়া বিরাট ভুল'( কার লেখা জানি না) অনেকের লেখা উপযাচক ইনবক্সে কারেকশন করে দিয়ে ক্ষমা চেয়েছি। তারাও দেখি আমার থেকে বেশি বিনয় প্রকাশ করেছেন সে কারেকশনে। কারেকশনের ক্ষেত্রে কেউ চাইলে তো কথাই নেই। ক্ষুদ্র বিবেকে যা পারি প্রাসঙ্গিক বিষয় ঠিক রেখে তা করে দেওয়ার চেষ্টা করি। এ ব্যাপারে কাউকে না করার স্বভাব নেই আমার, যদিও আমার কাছে কারেকশন করে নেওয়া অনেকেই আবার বড় বড় বোদ্ধার কাছে কারেকশন করে নিতে গিয়ে উক্ত বোদ্ধার মুখে শুনেছেন 'এটা নিয়ে বসতে হবে!' আমার বসার মতো অত সময় নেই, উপস্থিত মাথায় যা আসে প্রাসঙ্গিক কিছু করার চেষ্টা করি মাত্র। সবচেয়ে বড় কথা, পন্থা দেখিয়ে দিয়ে বলি 'এটুকু মেনে চললে আমার কাছে আর আসতে হবে না।' আবার কারো কারো লেখা যখন কারেকশন করে দিই, সে লেখাটা দেখা গেলো কোন পত্রিকায় প্রকাশ পেয়ে গেলো। আমি আবার কতদিন আগ থেকে সেখানেই ওর চেয়ে ভালো লেখা পাঠিয়েছি তো প্রকাশ হয় না। আমার আশপাশে অনেকেই এ ঘটনা জানেন, এবং তার প্রমাণও পান। শুধু আমারই নয়, অনেকেরই ভালো লেখা ওসব পাতায় প্রকাশিত হয় না। তবে যাদের লেখা কারেকশন করি তারাসহ যাদের ভালো লেখা প্রকাশ পায় না, তাদের নিকট থেকে কোনো রসিক জবাব না পেলেও আমার একযুগ বয়সি ছেলেটা সে জবাবটা দিতে পেরেছে আমাকে 'তাহলে আব্বু, তুমিও কারো কাছ থেকে তোমার লেখা কারেকশন করে নিয়ে পাঠাও, তাহলে ছাপা হবে!' ছেলে আমার এমন কথা বলেছে ঠিক আছে, কিন্তু কোনো বোদ্ধাগণ আমাকে কেন কোনো কারেকশন দেন না সে বিষয়ে আমি আজও অজ্ঞ!

ফেসবুকের মাধ্যমে নাকি অন্য পন্থায়, যা হোক, তা মনে নেই- একজন প্রায়ই আমাকে ফোন করে বলতো 'বর্তমান অমুক, তমুক, আপনি, টাপনি ইত্যাদি কয়েকজন বেশ ভালো লিখছেন এবং আপনাদের প্রকাশ সবচেয়ে বেশি। আমি আপনাদের ছন্দ অনুসরণ করি। তখন আমার বিনয় আরো বেড়ে যায় 'ভাই, চেষ্টা করি মাত্র।' যা হোক, কোনো এক বইমেলায় তার সাথে দেখা হলো, কথা হলো, আরো বেশি ভালোবাসা হলো তো সে এক ফাঁকে বললো 'আমি সেদিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন অমুক, তমুক, আপনি, টাপনি ইত্যাদির মতো আমারও লেখা প্রকাশ পাবে!' আমি এবার আরো বিনয়ী 'চেষ্টা করলে অবশ্যই পারবেন।' কারণ নজরুলের "মানুষ" কবিতার অনেকখানেই বলা হয়েছে মানুষকে ছোট ভাবতে নেই। যেমন- ‘ও কে? চণ্ডাল? চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!/ ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র ওই শ্মশানের শিব।/ আজ চণ্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট/ তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।’ আজ তিনি অনেকটা সফল। কারণ আগের ও সব জায়গার কোনো কোনোখানে অমুক, টমুক, আমি, টামি নেই! কিন্তু সে বেশি না থাকলেও দুয়েক জায়গায় আমাদের চেয়ে বেশি আছে। ইদানিং আমার লেখা যে পত্রিকায় বেশি প্রকাশ পেয়ে আসছে, আমার কাছে না হলেও আমার আশপাশের আমারই শুভার্থীদের কাছে সে নাকি সেই পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদকের মোবাইল নম্বর এবং তার বাসা খুঁজছেন! আমার কাছে চাইলে তা যেভাবেই হোক, ম্যানেজ করে দিতাম তো।

যা হোক, যারা বিভিন্ন পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক আছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি দেশজুড়ে অনেকেই লেখালেখির চেষ্টা করছেন এবং তারা অনেকেই ভালো লিখছেন। তাদের প্রকৃত মেধা বিকাশে অাপনাদের ভূমিকা অনেক। আপনাদের উৎসাহ নতুনদের যেমন উৎসাহিত করবে, একটা ভালো মানের লেখা পড়ে নতুনরা তেমন শিখতেও পারে। তাই কারো কোনো বড় পদ থাকলেই তিনি যেমন বড় কোনো লেখক হতেও পারেন, নাও হতে পারেন, একইভাবে কেউ ছোট পদে থেকেও বড় পদের অনেকের চেয়ে তিনি ভালো লিখতেই পারেন। অতীত ইতিহাসকে আজ যেমন আমরা বিশ্লেষণ করছি, বর্তমান লেখকদেরও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিচার করবে সেভাবেই। তবে যাদের দাবি, তারা ব্যতীত আর কেউ ভালো লেখেন না, তাদের দৌরাত্ম একটু বেশি বেশি। স্বভাব কবি হতে গিয়ে নিজের কী কী অভাব সেটা ভুলে গেছে তারা। তাই নিজেকে বড় ভাবতে থাকায় তাদের দৌরাত্মে ভালো লিখিয়েরা সচেতন থেকেও টিকতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বিভাগীয় সম্পাদক মহোদয়গণ ভালো লিখিয়েদের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারেন।

লেখক: শিক্ষক, ছড়াকার 
 
 

No comments

Theme images by Jason Morrow. Powered by Blogger.